• সুবিধাঃবেষ্ট হার্ডওয়ার ও বাজেট প্রাইস
  • অসাধারন ক্যামেরা
  • মি ইউয়াই ১০ (miui 10) একটি অসাধারন সফটওয়ার

অসুবিধাঃ

  • দেখতে অনেকটা আইফোন ১০ এর কপি
  • ইউআই তে কোন অ্যাপ ড্রয়ার নাই
  • মি ইউআই ১০ এ অ্যাড সংযুক্ত

মি ৮ ফোনটি প্রায় ৩ মাস আগে জুন এ বাজারে এসেছে। প্রথমেই ফোনটি স্পেক্স দেখে সবারই একই কথা মনে হয়েছে – “ওয়ান প্লাস ৬ এর শক্তিশালি প্রতিদ্বন্দ্বী…” তখন ফোনটির কোন রিভিউ না দিতে পারলেও এখন আমাদের হাতে এই ফোনটিকে নিয়ে অনেক কিছুই আছে লেখার।

সবার আগেই বলা উচিত, ফোনটির দাম ওয়ান প্লাস ৬ এর চেয়েও কম, মাত্র $৩৯০ যা ওয়ান প্লাস ৬ এর চেয়ে ৳১৪০ কম। শুনে একটু ধাক্কা লাগতেই পারে, তাই না? ফোনটি তে ফ্ল্যাগশীপ হার্ডওয়ার আছে তা আপনাদের মাঝে অনেকেই জানেন। তাহলে কেন এই ফোন নিয়ে এত কৌতুহল আমাদের? সেটি হচ্ছে ফোনটির নতুন সফটওয়্যার – মি ইউআই ১০

ডিজাইন

শাওমি মি ৮ দেখতে অনেকটাই আইফোন ১০ এর মত। পিছনের ডুয়েল ক্যামেরা থেকে শুরু করে সামনের নচ টাও দেখতে অবিকল আইফোন ১০। পাশাপাশি রাখলে ফোন দুটির মাঝে পার্থক্য করা বরই কঠিন। অনেক ফোনই গত এক বছরে আইফোন ১০ কে কপি করেছে। কিন্তু মি ৮ সবচেয়ে বেশী আইফোন ১০ এর কাছাকাছি হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছে। এমনকি সফটওয়্যার ও দেখতে অনেকটাই আইফোন এর আইওএস এর মত।

মি ৮ এর সামনে ও পিছনে রয়েছ করনিং গোরিলা গ্লাস ৫ এর প্রোটেকশন, যা ফোনটিকে অনেক আঘাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম কিন্তু ভার্সন ৩ এর মত অতটা স্ক্র্যাচ প্রুফ না। ফোনটি কোন রকম প্রোটেকশন কেস ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে এর স্থায়িত্ত সহজেই বুঝা যায়। এর স্থায়িত্ত অনেক ভাল হলেও স্ক্র্যাচ প্রবনতা অনেক বেশী।

ফোনটি ব্যাবহার এর শুরুতেই পিছনে একটি বড় স্ক্র্যাচ পরে যায়, এবং তখন মনে হয়েছিল যে, হয়ত প্রোটেকশন ছাড়া ফোনটি খুব সহজেই স্ক্র্যাচে ভরে যাবে। কিন্তু অনেক শক্তভাবে এটিকে ব্যবহারের পরেও তেমন কোন বড় স্ক্র্যাচ চোখে পরে নাই। তবুও যারা ফোনটি কিনেছেন অথবা কিনতে চাচ্ছেন, তাড়া অবশ্যই একটি প্রোটেকশন কেস কিনে নিবেন। ফোনটি হাতে নিলে সামনে ও পিছনের গ্ল্যাস টি অনেক নমনীয় মনে হয়, যা আপনাকে একটা আলাদা প্রিমিয়াম ফিল দিবে আশা করি।

ফোনটির সবগুলো বাটনই ডানদিকে অবস্থিত। পাওয়ার বাটনটি ঠিক মাঝখান থেকে একটু উপরে বসানো এবং এর উপরেই বসানো ভলিউম রকারস গুলো। সিম ট্রে টি বামদিকে উপরে বসানো। আর নিচে রয়েছ একটি ইউএসবি টাইপ-সি পোর্ট এবং দুটি স্পিকার গ্রিল। সামনের দিকে পানি দেখবেন একটি বড় নচ রয়েছ, এক্সেখানে ফ্রন্ট ক্যামেরা বসানো এবং নিচের কিছুটা বেজেলও রয়েছে। পিছনে একটি ডুয়েল ক্যামেরা সেটআপ রয়েছে এবং তার নিচে মাঝ বরাবর রয়েছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর।

সবকিছু মিলিলে ফোনটি দেখতে সুন্দর হলেও স্পেশাল কিছু পাবেন না ফোনটিতে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, সিম্পল ডিজাইনই এই ফোনটিকে আলাদা করেছে।

ডিসপ্লে

মি ৮ এ ৬”২১’ সাইজের একটি বিরাট ডিসপ্লে আছে যা বর্তমানের বাজারে একদম মানানসই। ফোনটির স্ক্রিন রেজুলেশন ১০৮০ * ২২৪৮ যা ৪০২ পিপিআই রেজুলেশন তৈরী করে। এখানে স্পেশাল কিছু পাওয়া যায় নাই কিন্তু শাওমি এইচডিআর ডিসপ্লে ব্যবহার করেছে যা ডিসপ্লে কে করেছে অনেক উজ্জল। এতে স্ক্রিন এর ব্রাইটনেস ও বেড়েছে এবং সূর্যের আলোতে দেখতেও অসুবিধা হয় নাই। শাওমি এটিকে “সানলাইট ডিসপ্লে” নামে অভিহিত করছে এবং এর উদ্দেশ্য ডিসপ্লের কালার ঠিকভাবে দেখানো এবং ব্যাটারী লাইফ ও বাড়ানো। যদি আপনার স্পেশাল্ভাবে বেশী উজ্জ্বল কালারের দরকার না থাকে, এই ডিসপ্লে আপনাকে বেশ ভালো অভিজ্ঞতা দিতে সক্ষম এবং আপনার ফোনের ব্যাটারী লাইফ ও বৃদ্ধি করতে সক্ষম।

শাওমি মি ৮ এর স্ক্রিন কিছুটা নমনীয় এবং স্যামসাং এর তৈরীকৃত স্ক্রিন হওয়া সত্তেও ডিসপ্লে দেখতে স্যামসাং এস ৯ এর তুলনায় অনেকটাই নীলাভ। শাওমি তাদের ডিসপ্লেগুলো কিছুটা টিউন করে রাখে, যেন সব ধরনের কাস্টমারই এই ফোনটি পছন্দ করে। সবকিছু মিলিয়ে এই ডিসপ্লে দেখে আপনি খুব আশ্চর্যও হবেন না, আবার বিরক্তও হবেনা না।

পারফরমেন্স

আমরা যেমনটা ভেবেছিলাম, ফ্ল্যাগশীপ ফোন হিসেবে, শাওমি মি ৮ ঠিক তেমনটাই পারফর্ম করেছে আমাদের টেস্টগুলোতে। ফোনটিতে কোনরকম ল্যাগ চোখে পরে নাই। ১০০+ ক্রোম ট্যাব খুলেও রেখেও এতে কোনরকম ল্যাগ চোখে পরে নাই। ফ্ল্যাগশীপ ফোনগুলোর পারফরমেন্স টেস্টিং অত্যন্ত কঠিন কাজ, কারন প্রায় সব ডিভাইসই প্রায় একি রকম পারফরমেন্স দেখায়। তাই বেঞ্চমার্ক টেস্ট করাটাই এখনো সর্বোত্তম উপায়।

আমরা গীকবেঞ্চ, অ্যানটুটু, ৩ডিমার্ক টেস্ট করেছিলাম দেখার জন্য যে ফোনটির পারফরমেন্স কেমন-

  • গীকবেঞ্চ ৪ এর রেজাল্ট এ সিঙ্গেল-কোর এ ২৪০৩ আসে, যা ওয়ান প্লাস ৬ এ ছিল ২৪৫৪ এবং গ্যালাক্সি এস ৯ এ ২১৪৪। মাল্টিকোর এ পাওয়া যায় ৮৫৪৫ যা, ওয়ান প্লাস ৬ এ ছিল ৮৯৬৭ এবং গ্যালাক্সি এস ৯ এ ৮১১৬।

হার্ডওয়্যার

২০১৮ এর বাকি সব ফ্ল্যাগশীপ ফোন এর মতই শাওমি মি ৮ ও স্ন্যাপড্রাগন ৮৪৫, এবং ৬ জিবি র‍্যাম দিয়ে বেজ মডেল ছেড়েছে। এছাড়াও থাকছে ৮ জিবি র‍্যাম ও ২৫৬ জিবি স্টোরেজ ক্যাপাসিটির প্রিমিয়াম মডেল।

শাওমি মি ৮ এর ব্যাটারি অনেকটাই সাধারন। আমাদের টেস্টে এর রেজাল্টে ৪ ঘন্টা থেকে ৬ ঘন্টা পর্যন্ত স্ক্রিন টাইম পেয়েছি যা ব্যবহারকারীর উপর ডিপেন্ড করবে। ৮ টি ভিন্ন ভিন্ন টেস্টের পরে আমরা গড়ে ৫ ঘন্টা ৩৫ মিনিট স্ক্রিন টাইম পেয়েছি। এই গড় অনেক টাই ওয়ান প্লাস ৬ এর এর স্ক্রিন টাইম এর সমান, যার ৩৩০০ এমএএইচ ব্যাটারী আছে। ফোনটি গ্যালাক্সি নোট ৯ এর মত ডিভাইসের সাথে তুলনা করা যায় না, যার ৪০০০ এমএএইচ ব্যাটারী আছে। কিন্তু এই ফোনটি আপনি অনায়াসেই সারাদিন ধরে ব্যবহার করতে পারবেন।

ফোনটিতে কোন হেডফোন জ্যাক নেই, যা বর্তমানে একরকম একটা ফ্ল্যাগশীপ স্ট্যান্ডার্ড হয়ে গিয়েছে। মি ৮ এ আছে ব্লুটুথ ভার্সন ৫.০। যদি আপনি এই ভার্সন সাপোর্ট করে এমন ব্লুটুথ হেডফোন পান, তাহলে এটি কাজে আসবে অনেকটাই। মি ৮ এ কোন অফিসিয়াল আইপি রেটিং অথবা পানি রোধক অন্যকোন সার্টিফিকেট নেই।

ক্যামেরা

একটি আশ্চর্য বিশয় হল, মি ৮ এর ক্যামেরা যথেস্ট পরিমান উন্নত। ক্যামেরাটি স্যামসাং এর মত অতিরিক্ত শার্প না হলেও এর ডাইনামিক রেঞ্জ ও শার্পনেস অনেক ভাল এবং প্রয়োজন মত। আমাদের বেশকিছু টেস্টিং এ আমরা ভাল কিছু ছবি পেয়েছিলাম। এছাড়াও বিশ্ব বিখ্যাত অ্যাান্ড্রয়ড অথোরিটির টেস্ট এর কিছু রেজাল্ট নিচে দেখানো হল। আর এই ফোনের অপারেটিং সিস্টেম এর কারনে ক্যামেরা পারফরমেন্স আরো ভাল হয়েছে।

মি ৮ এর ক্যামেরা স্যাম্পল। দিনের পর্যাপ্ত আলোতে তোলা এই ছবিটি
মি ৮ এ রাতের আলো আধারে তোলা এই ছবিটি

সফটওয়্যার

শাওমি কোম্পানির শুরুই হয়েছিল সফটওয়্যার দিয়ে। মিইউআই ছিল একটি রম যা সায়ানোজেনমড এর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত। এমনকি এখনও এই রমটি তাদের বেটা চ্যানেলে নিয়মিত আপডেট করা হয়। এই রম এ ইউজার ফিডব্যাক এর মাধ্যমে নতুন ফিচার যুক্ত করা হয়ে থাকে। শাওমি কর্মীদের নিয়মিত ফোরাম পোস্ট পড়তে ও তার উত্তর দিতে হয়।

মিইউআই সবকিছু মিলিয়ে অনেকটাই সহজ মনে হয় এখন। এর কোন অ্যাপ ড্রয়ার নেই। যদিও এটি আইফোনের ইউআই কে নকল করা মনে হয়, কিন্তু শাওমি বর্তমানে চায়নার সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ড। আর এইখানে প্রায় সব ফোনই আইফোনকে কপি করার চেস্টা করে।

শাওমির সবচেয়ে লেটেস্ট মিইউআই ১০ আপডেটটি অ্যাান্দ্রয়েড ৮.১ ওরিওর উপর ভিত্তি করে ডিজাইন করা। কিন্তু ওএস টি অনেকটা অ্যান্ড্রয়েড ৯.০ পাই এর ফিচার ব্যবহার করেছে। এমনকি ইউআই ও গোলাকার ভাবে ডিজাইন করা। গুগলের ম্যাটেরিয়াল ডিজাইন ভার্সন ২.০ আপডেট আসায়, তা ব্যবহার করা হয়েছে এই ইউআই তে। ডিসপ্লে এর যেকোন জায়গায় ট্যাপ করে আপনি গুগল সার্চ করতে পারবেন।

বামদিকে সোয়াইপ করে আপনি কুইক অ্যাপ ফিচারটি ব্যবহার করতে পারবেন, যা শাওমি গাইড নামে পরিচিত। এই ডিজাইন টি অনেকটাই আইওস এর মত। এইখান থেকে আপনি ক্যাস ক্লিয়ার করতে পারবেন, ক্যালেন্ডারে ইভেন্ট অ্যাড করতে পারবেন, নোট নিতে পারবেন এবং শেয়ার বাজারের স্টক এর দাম জানতে পারবেন। এই উইজেটগুলো বিভিন্ন শাওমি অ্যাপ এর মাধ্যমে ডিভাইসে প্রি-লোড করা থাকে, যা আমাদের কাছে অনেক ব্যবহারোপোযোগী মনে হয়েছে। উইআই টিতে শাওমির ফোরাম এর জন্য একটি অ্যাপ ও ইন্সটল করা আছে।

গুগল অ্যাপ গুলোর কপি কোন অ্যাপ শাওমি বানায় না এবং কোন অ্যাপ জোর করে ইউজারকে ব্যবহারে বাধ্য করে না। শাওমির এই ভাবে ওস টি ছাড়ায় ইউজার অনেক উপকৃত হয়, যা স্যামসাং একদমই করতে চায় না। অনেক অ্যাপ আছে স্যামসাং এর যা একদমই ব্যবহারের উপযোগী নয়, তারপরও জোর করা হয় ইউজারদের ব্যবহার করতে।

মিইউআই ১০.০ আপডেট এ শাওমি ফুল স্ক্রিন জেসচার এর সাপোর্ট দিয়েছে। এইটা অ্যান্ড্রয়েড ৯.০ এর জেসচার কে কপি করা নয় কিন্তু যথেস্ট ভাল। আপনি নিচে সোয়াইপ করে হোম এ জেতে পারবেন, হোল্ড করে সাম্প্রতিক অ্যাাপ অপশন এ যেতে পারবেন অথবা বাম বা ডান দিক থেকে সোয়াইপ করে আগের স্ক্রিন এ যেতে পারবেন। এটি গুগলের জেসচার এর চাইতে ভাল বলে মনে হয়েছে। শাওমির ফুল স্ক্রিন মোডটি অনেক ভাল মনে হয়েছে।

শোমি মি ৮ কোন তাক লাগানো ডিভাইস নয়। এটি দেখে আপনার বন্ধুরা আশ্চর্যও হবে না। ফোনটি খুব আকর্ষণীয় বা অদ্ভুত ও মনে হবেনা। আপনি এর এটি নতুন মিউইআই এর জন্যই বানানো, যা আপনি অতি সহজেই বুঝতে পারবেন। ফোনটির দাম ৳৩৩,০০০ এর কিছু কমবেশী রাখা হয়েছে।

Related

কমেন্ট করুন